Skip to content

৮টি জরুরি বিষয় যা গরুর খামার করে সফলতা পেতে মানতেই হবে

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় গরুর খামার করে লস গরুর খামার করে সফলতা গরুর খামার করে স্বাবলম্বী গরুর খামার করে লাভবান গরুর খামার বাংলাদেশ গরুর খামার তৈরি গরুর খামার করতে কি কি লাগে গরুর খামার করতে চাই

বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গবাদিপ্রাণি রয়েছে ১৪৫ টি । আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই সংখ্যা মাত্র ৯০, চীনে ১৪, ব্রাজিলে ২০। কিন্তু উৎপাদনের দিক দিয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে ও গরুর খামার করে সফলতা হার খুব কম। গাভী প্রতি উৎপাদন ভারতের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ। উৎপাদনশীলতা কম হওয়ার মূল কারণ মূলত পুষ্টির অভাব, রোগ-বালাই, ব্যবস্থাপনিক দুর্বলতা এবং উন্নত জাতের অভাব। তবে গাভীকে সঠিক পুষ্টি প্রদান, উন্নত ব্যবস্থাপনায় লালন পালন এবং চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে দৈহিক ওজন এবং গাভী প্রতি উৎপাদন কয়েকগুন বৃদ্ধি করা সম্ভব ।

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় গরুর খামার করে লস গরুর খামার করে সফলতা গরুর খামার করে স্বাবলম্বী গরুর খামার করে লাভবান গরুর খামার বাংলাদেশ গরুর খামার তৈরি গরুর খামার করতে কি কি লাগে গরুর খামার করতে চাই

আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করব গরুর খামার করে সফলতা পেতে হলে যে সকল বিষয় সবসময় মাথায় রেখে চলতে হবে:-

 

১) বছরব্যাপী কাঁচা ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিতকরণঃ

আমাদের দেশের খামারীরা গাভীকে কাঁচাঘাস দেয়ার জন্যে প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভরশীল । প্রকৃতিতে সাড়া বছর সমপরিমানে কাঁচাঘাসের উৎপাদন থাকে না বিশেষ করে শুস্ক মৌসুমে । কিন্তু গাভী থেকে কাংখিত মাত্রায় দুধ পাওয়ার জন্যে সারা বছর সমপরিমানে কাঁচা ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

এক্ষেত্রে ধান, পাট অনান্য ফসলের মতো মাঠে সারা বছর উৎপাদন হয় এমন প্রজাতির উন্নত জাতের কাঁচা ঘাসে আবাদ করতে হবে। সারা বছরব্যাপী কাঁচা ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

 

২) রোগ-বালাই দমনঃ

সফলভাবে গাভী পালনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সঠিকভাবে গবাদীপশুর রোগ-বালাই দমন । কেননা রোগবালাই আক্রান্ত কখনও তার উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী সঠিক উৎপাদন (দুধ উৎপাদন) করতে পারে না। এমনকি অনেক সময় গাভী মারাও যেতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগাক্রান্ত গাভীর সময়মত চিকিৎসা না করার কারণে প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রচুর পরিমান গরু মারা যায় । সময়মত চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে গবাদিপশু মৃত্যুহার কমানোর জন্য আমাদের দেশে যে পরিমান পশু চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদানের সংশিষ্ট সেবা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন সে পরিমান পশু চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র আমাদের দেশে নেই ।

চিকিৎসা সেবা খামারীদের কাছে সার্বক্ষনিক ও সহজলব্য করতে হবে এবং সব সময় একজন ভেটেরিনারী চিকিৎসক এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।।

 

৩) সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণঃ

আমাদের দেশে অধিকাংশ গবাদি প্রাণী মারা যায় বিভিন্ন প্রকার সংক্রামক রোগে। সংক্রামক রোগে একবার গবাদি প্রাণী আক্রান্ত হলে চিকিৎসা করে তেমন ফল পাওয়া যায় না। আর যদি কোন প্রাণী বেচেঁ যায় তাহলে তার কর্মক্ষমতা এবং উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।

তাই সংক্রামক রোগ থেকে গবাদি প্রাণীকে রক্ষা করতে হলে নিয়মিত টিকা প্রদান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের দেশের গবাদি প্রাণীর শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কাংখিত মাত্রায় উৎপাদন দিতে পারে না।

গাবাদীপশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে মৃত্যুহার কমানো এবং উৎপাদনশীলতা ঠিক রাখার লক্ষ্যে খামারীদের নিয়মিত সিডিউলভিত্তিক টিকা প্রদানে উৎসাহিত এবং অভ্যস্থ করতে হবে এবং সকল গরুকে টিকা প্রদান এবং কৃমিনাশক প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

 

৪) দৈনিক হিসাব লিপিবদ্ধকরণঃ

আমাদের দেশের অধিকাংশ গাভী পালনকারী দীর্ঘ সময় ধরেই গাভী পালন করে আসছে কিন্তু গাভী পালন করতে কত টাকা ব্যয় হয় এবং দুধ উৎপাদন করে কত টাকা আয় হয়, কখনও গাভ কে টিকা দিতে হবে, কখন গাভী গরম হয়, কখন গাভীকে কৃত্রিম প্রজনন করাতে হবে তা সঠিকভাবে জানেও না এবং কোন রেকর্ড রাখে না।

কিন্তু লাভজনক উপায়ে গাভী পালনের জন্যে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গাভী পালন সংক্রান্ত এ সকল মৌলিক তথ্য (গাভীর আদর্শ বাসস্থান, রোগবালাই, গাভীর কৃত্রিম প্রজনন, কৃমিনাশক খাওয়ানো, টিকা প্রদান, খাদ্য প্রদান, চিকিৎসা, ওজন নির্ণয় ইত্যাদি) লিপিবদ্ধ করে রাখার ক্ষেত্রে খামারীদের উৎসাহিত তুলতে হবে।

 

৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নঃ

খাদ্যই প্রতিটি জীবের মূল চালিকাশক্তি। প্রত্যেক জীবেরই বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন হয়। গাভীও এর ব্যতিক্রম নয়। গাভী হতে অধিক হারে দুধ পেতে হলে খাদ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

যদি খাদ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা যায় তাহলেই গাভীকে একটি লাভজনক প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণী যে সব খাবার গ্রহণ করে বেঁচে থাকে, সে সব খাদ্য মূলত ছয়টি উপাদানে গঠিত । এই ছয়টি পুষ্টি উপাদান সমপরিমানে বিদ্যমান খাদ্যেকে সুষম খাদ্য বলে যা গাভীর শরীর কর্মক্ষম এবং তার উৎপাদনশীলতা সঠিক রাখতে অত্যাবশ্যক ।

খাদ্যে ছয়টি পুষ্টি উপাদনের যে কোন একটির অভাব হলে প্রাণী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে এবং তার উৎপাদন কমে যাবে। তাই কেবলমাত্র একজাতীয় খাদ্য খেয়ে শরীরের সব পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

কারণ একেক জাতীয় খাদ্যে একেক রকমের পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে। গাভীর বয়স ও দুধ উৎপাদন অনুসারে খাদ্যের প্রকার ও পরিমাণে ভিন্ন হয়ে থাকে।

তাই গাভীর শরীর ঠিক রাখতে এবং দুধ উৎপাদন সঠিকমাত্রায় রাখতে সুষম খাদ্য তৈরী, দুধ উৎপাদন ও বয়সভেদে তা সরবরাহ এবং এ সংক্রান্ত সঠিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা প্রতিটি গাভী পালনকারী খামারীর থাকা দরকার।

খাদ্যের গুনগতমান বিবেচনা করে খাদ্য প্রদান। সুষম খাদ্য তৈরীকরণ | সুষম খাদ্য নিয়মিত গাভীকে সরবরাহ করতে হবে।

 

৬) দুগ্ধবতী গাভী হতে দুধ উৎপাদনঃ

কাংখিত পর্যায়ে রাখার জন্যে নিয়মিত কাঁচা ঘাস সরবরাহের কোন বিকল্প নেই। আমাদের দেশের তথা প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ খামারীরা গাভীকে কাঁচা ঘাস সরবরাহের ক্ষেতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁচা ঘাসের উপর নির্ভরশীল কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে সারা বছর সমভাবে প্রকৃতিতে কাঁচাঘাসের উৎপাদন থাকে না বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ।

ফলে খামারীরা সারা বছর সমভাবে গাভীকে কাচা ঘাস দিতে পারে না বলে তারা গাভী থেকে কাংখিত মাত্রায় দুধ পায় না। এ সমস্যা থেকে খামারীদের বের করে আনার জন্যে তাদেরকে উন্নত জাতের কাচা ঘাস চাষ করতে হবে ও প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং পাশাপাশি ঘাস চাষে অভ্যস্থ হতে কাটিং সরবরাহ করতে হবে এবং চাষ পদ্ধতি হাতে কলমে শিখতে হবে।

 

৭) বাসস্থান ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নঃ

গাভী পালনের আদর্শ বাসস্থান ব্যবস্থাপনা বলতে গোয়ালঘরটিতে পর্যাপ্ত আলো-বায়ু চলাচল ব্যবস্থা থাকবে, গাভী দাড়ানোর মত প্রয়োজনীয় জায়গা থাকবে, ঠান্ডা, উষ্ণ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া ও ক্ষতিকর প্রাণী থেকে গাভীকে রক্ষার প্রযোজনীয় ব্যবস্থা থাকবে, সহজে খাদ্য প্রদান, দুধ গ্রহণ এবং গোবর মূত্র নির্গমন ও নিষ্কাশনে ব্যবস্থা থাকবে এমন সুযোগ সুবিধা সম্বলিত গোয়ালঘরকে বুঝায় ।

এ সকল ব্যবস্থা থাকলে গাভী রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় বেশি এবং দুধ উৎপাদনও কম হয়ে থাকে। এ বিষয়ে বেশির ভাগ খামারীর স্বচ্ছ ধারণা ও জ্ঞান নেই।

 

৮) চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নঃ

লাভজনকভাবে গাভী পালনের পূর্বশত গাভী থেকে নিয়মিত কাংখিত মাত্রায় দুধ উৎপাদন করা । গাভীর নিয়মিত কাংখিত মাত্রায় দুধ উৎপাদন ভাল জাত, ভালো খাদ্য ও বাসস্থান এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল ।

গাভী কে নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য প্রদানের পাশাপাশি রোগমুক্ত রাখতে হবে। গাভীকে রোগমুক্ত রাখার পূর্বশত গাভীকে নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন এবং কৃমিনাশক প্রদান করতে হবে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ খামারী গাভীকে নিয়মতি টিকা প্রদান করে । ফলে প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রচুর গরু নানাবিদ সংক্রামক রোগ যেমন: তড়কা,বাদলা, গলাফোলা, ক্ষুরারোগে । মারা যায়। এছাড়া এ সব রোগে আক্রান্ত হওয়া গরু বেচে থাকলেও তা থেকে পরবর্তীতে কাংখিত মাত্রায় দুধ পাওয়া যায় না।

 

উপসংহারঃ

গ্রাম বাংলার কৃষকের কাছে গাভী পালন একটি প্রাচীন পেশা বিশেষ করে নদী অববাহিকা ও চর অঞ্চলে গাভী পালন অত্যন্ত লাভজনক পেশা। প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে গাভী পালন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই সম্পদের যথাযথ যত্ন নিলে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা (দুধ ও মাংস) পূরণের সাথে পারিবারিক জ্বালানী চাহিদা এবং নগদ অর্থেরও প্রাপ্তি ঘটে। কৃষি নির্ভর এই দেশের কৃষিকাজে বিভিন্ন গবাদি প্রাণীর সঙ্গে গাভী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

গাভী পালন অধিক লাভজনক হওয়ায় অনেকে এখন গাভী পালন করছেন। গাভী পালন করার ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যথাযথ কারিগরী পরামর্শ, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞানের বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বর্নিত সমস্যা দূর করা গেলে নি:সন্দেহে এ খাত আমাদের অর্থনীতিতে আরো অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে। ফলে একদিকে যেমন খামারীদের আয় বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে এ সাব-সেক্টরে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *