Skip to content

 

মাছ চাষে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও মাছ চাষে সার প্রয়োগঃ মাছ চাষে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এর ব্যবহার + আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ + মাছ চাষে ইউরিয়া + মাছ চাষের উপায় + মাছ চাষ কিভাবে করা যায় + মাছ চাষে পটাশ এর ব্যবহার

মাছ-চাষে-উন্নত-খাদ্য-ব্যবস্থাপনা-ও-মাছ-চাষে-সার-প্রয়োগ-মাছ-চাষে-চিুন-ইউরিয়া-পটাশ-এর-ব্যবহার
Table of contents

বিষয়: মাছ চাষে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও মাছ চাষে সার প্রয়োগঃ মাছ চাষে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এর ব্যবহার, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, মাছ চাষে ইউরিয়া, মাছ চাষের উপায়, মাছ চাষ কিভাবে করা যায়, মাছ চাষে পটাশ এর ব্যবহার।
হ্যাশট্যাগ:#মাছ চাষে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা#মাছ চাষে সার প্রয়োগ করা নিয়ম#মাছ চাষে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এর ব্যবহার#আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ#মাছ চাষে ইউরিয়া#মাছ চাষের উপায়#মাছ চাষ কিভাবে করা যায়#মাছ চাষে পটাশ এর ব্যবহার।

জমাজমিতে সার ব্যবহার করে যেমন ফলন বাড়ানো সম্ভব, তেমনি মাছের পুকুরেও সার প্রয়োগ করে মাছের ফলন বাড়ানো যায়। পুকুরের পানিতে যে রাসায়নিক সমতা আছে- সার প্রয়োগের ফলে ঐ সমতা নষ্ট হয় বটে, কিন্তু ক্রমে ক্রমে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। সার প্রয়োগের ফলে মাছের খাবার অনেক গুণ বাড়ে এবং সেজন্যই সার ব্যবহৃত পুকুরে মাছের ফলন বেশি হয়।

মাছ চাষের সার এর প্রকারভেদ

মাছ চাষের সার দুই প্রকার যথা: ক. জৈব সার, খ. অজৈব সার।

  • মাছের খাবার যোগান তথা পুকুরে মাছের খাদ্য আবেষ্টনীর স্থিতিশীলতা রক্ষা করার জন্য সার প্রয়োগ করা হয়।
  • মাছেরা কোনো সার সরাসরি খায় না, পানিতে বা পুকুরের তলদেশের মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, ক্যাসিয়াম ও পটাসিয়াম্ প্রভৃতির অভাব হলে সূর্যকিরণের সাহায্যে ক্ষুদে ক্ষুদে শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ জন্ম নিতে পারে না। আর এর অভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলজপোকা ও পোকাণুর (যা মাছেরা খায়) জন্ম হয় না। এ জন্যেই সার দিয়ে এসব খাদ্যের উপস্থিতি রক্ষা করা হয়। রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাছের খাবার তাড়াতাড়ি জন্ম নেয়।
  • তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যে মাছের খাবার যোগানোর জন্য পুকুরের পানিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে ক্ষেত্র বিশেষ জৈব সার প্রয়োগ করারও প্রয়োজন আছে। এ সার দিয়ে পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন ও খাবার যোগান এ দুই-ই হয়।
  • নতুন পুকুর বা বালুকাময় পুকুরে জৈব সার প্রয়োগ করা হয়। কারণ, এতে পুকুরের মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। অবশ্য জৈব সার প্রয়োগ করলে পুকুরের পানিতে নানা প্রকার পোকা-মাকড়ও জন্ম নেয়।

মাছ চাষে চুনের ব্যবহার

  • পানির উপর চুনের বিভিন্ন প্রকারের প্রভাব থাকায় পুকুরের উর্বরতা বাড়ানোর প্রাথমিক পন্থা হিসেবে চুন ব্যবহার করা হয়। চুন ব্যবহারে মাটি ও পানির অম্লতা দূর হয়।
  • চুনের কিছু অংশ পানিতে মিশে, কিছু অংশ মাটিতে জমে এবং কিছু অংশ মাছসহ অন্যান্য জীবনের শরীরে যায় ৷ যখন পুকুরকে শুকানো হয় তখন চুন পানিতে বাই-কার্বনেট হিসেবে চলে যায়।
  • পুকুর থেকে মাছ সরাবার ফলেও কিছু চুন চলে যায়। চুন প্রয়োগে পানি ও কাদার অম্লতা চলে যায় এবং ক্ষরতায় পরিণত হয়। পি.এইচ. উপরে ওঠে এবং এর প্রভাবে মাটি থেকে পুষ্টিকর বস্তু (Nutrient) মুক্ত হয়। ব্যাক্টেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন পদার্থ ভেঙ্গে পুষ্টিকর বস্তু মুক্ত হয়।
  • বাফার ইলিমেন্ট হিসেবে চুন অত্যন্ত কার্যকরী উপাদান। এর প্রভাবে ফসফরাস ও পটাসিয়ামের ভূমিকা সুদৃঢ় হয় এবং পানির ক্ষারত্ব বৃদ্ধি করে।

মাছ চাষে চুন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চুন পানিতে ব্যবহার করার পর পানির কার্বন ডাই-অক্সাইটের সাথে মিশে ক্যাল্‌সিয়াম বাই-কার্বনেট তৈরি করে। এই বাই-কার্বনেট কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর একটি উৎস হিসেবে কাজ করে। উদ্ভিদ সূর্য কিরণের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে (কার্বন) কাজে লাগিয়ে খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন মুক্ত করে। মাছের জীবন ধারণের জন্য এ অক্সিজেন খুব প্রয়োজন। এ ভাবে ধীরে ধীরে অক্সিজেন মুক্ত হয় এবং বাই-কার্বনেট ভেঙে সৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড (কার্বন) উদ্ভিদের কাজে লাগে। এ অবস্থায় ক্যাল্‌সিয়াম কার্বনেট দ্রবীভূত হয়ে তলানি পড়ে। রাতের বেলা যখন এ রকম ফটোসিথেসিস্ হয় না তখন সমস্ত জলজীব ও বাতাস থেকে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড পানিতে মেশে তা ক্যাল্‌সিয়াম কার্বনেটের সাথে মিশে আবার পানিতে মিশে যায় (বাই-কার্বনেট)। দিনের বেলায় এ কার্বনেটের প্রক্রিয়া চলে এবং শেওলা জন্ম দিতে সাহায্য করে। এতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, চুন প্রয়োগের ফলে খাদ্য শিকলের প্রথম স্তর তথা সবুজ শেওলার জন্ম হয়।মাছ

মাছ চাষে চুন ব্যবহারের উপকারিতা

এ ছাড়া চুন প্রয়োগের ফলে আরো সুফল পাওয়া যায়। যেমন-

  1. চুন পুকুরের তলার মাটিতে মিশে এবং জৈবিক পদার্থের পচন ক্রিয়াকে তরান্বিত করে। তলার মাটিকে নিরপেক্ষ করার ফলে ফসফরাস্ আয়রণ বন্ড দুর্বল হয়ে যায়। ফলে লোহা সহজেই মুক্ত হয়। চুন ব্যবহারে মাছের হাড় বৃদ্ধি করে। মাছকে বাড়তে সহায়তা করে।
  2. চুন আসলে সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের ক্ষতিকর পদার্থকে বাধা দেয়। বাই-কার্বনেটের কাফারিং ক্ষমতা দিয়ে পি.এইচ-এর স্থিতিশিলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং উপরে উঠতে দেয় না। পানিতে এ্যামোনিয়ামের ক্ষতিকর লোহাকে জমতে না দিয়ে এর বিষাক্ত প্রক্রিয়া থেকে মাছকে রক্ষা করে।
  3. স্লেক্লাইম্ মাটির সালফিউরিক্ এসিডকে নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত সাফিউরিক এসিডের উপস্থিতিতে চুন অকেজো হয়ে যায়।
  4. কোইকলাইম্ একটি খাটি ক্যাসিয়াম অক্সাইড। একে চুনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়।
  5. দোঁ-আশ মাটিতে বেলে মাটির চেয়ে বেশি চুন দরকার।
  6. পুকুরের মাছ সরানো হলে যে পরিমাণ চুন চলে যায়, তা সাধারণত নুতন চুন দিয়ে আবার পূরণ করে দিতে হয়।
  7. চুন দেওয়ার পরও যদি মাছের খাদ্য না বাড়ে, তাহলে বুঝতে হবে যে, ঐ পুকুরের পানিতে পুষ্টিকর বস্তু নেই।
  8. অম্লপানিকে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে উর্বরাবস্থায় ফিরিয়ে আনয়নকে একান্ত মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা মনে করা হয়।

চুন যদিও জৈব ও অজৈব সারের কোনো বিকল্প নয়, তবে প্রয়োজনমতো চুন ব্যবহার করলেও ঐ সমস্ত সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। মাটি ও পানির অম্লত্ব জনিত ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নিবারণ করাকে চুনাকরণ (Liming) বলে।

ক্যাল্‌সিয়াম কার্বনেট পি.এইচ-কে ৮.৪ এর বেশি উঠতে দেয় না। এদিকে থেকে বিবেচনা করলে ক্যালসিয়াম কার্বনেটই সর্বোৎকৃষ্ট চুন। চুনের আরো সুফল আছে যেমন-

  1. চুন জাতীয় দ্রব্যগুলো জৈব পদার্থ বিয়োজনে সহায়তা করে। ফলে পুকুরের মৃত্তিকায় দ্রুত হিউমাস্ গড়ে ওঠে। চুন এঁটেল মাটিকে সুরহ করে এবং আঠালোভাব কমিয়ে দেয়। চুন প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে ও পানির অম্লতা লোপ পায়।
  2. চুন প্রয়োগে গ্রহণযোগ্য ফসফেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। চুনের প্রভাবে বিভিন্ন প্রকার ব্যাক্টেরিয়া কার্যতৎপরতা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায় এবং মাটিতে হিউমাস্ উৎপাদনের বেগ দ্রুততর হয়।
  3. অতিরিক্ত চুন প্রয়োগ করারও ঠিক নয়।
See also  খাঁচায় মাছের চাষ

মাছ চাষে বেশি চুন ব্যবহারের ক্ষতিসমূহ

বেশি চুনে নিম্নলিখিত ক্ষতি হয়-

  1. বেশি করে ঘন ঘন চুন প্রয়োগ করলে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায়। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে পি.এইচ খুব বেড়ে গেলে অথবা কমলে জীবাণুর সংখ্যাও তৎপরতা দুই-ই কমে যায়।
  2. উঁচু পি.এইচ এ অদ্রবণীয় জটিল সব ফটে যৌগ উৎপন্ন হতে দেখা যায়।
  3. পি.এইচ অত্যাধিক বেড়ে গেলে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, দস্তা প্রভৃতি অধঃক্ষিপ্ত হয়ে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন্‌ দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়তা করে না। এসব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে চুন প্রয়োগের পর নিয়মিতভাবে কিছু কিছু অজৈব সার ব্যবহার করা উচিত।

মাছ চাষে বিভিন্ন অজৈব সার প্রয়োগ

ফফেট সার

  • ফফেট সার পুকুরের পানিতে শেওলা বৃদ্ধিকে সাহায্য করে। পুকুরের তলদেশের মাটিতে আবদ্ধ নাইট্রোজেনকে মুক্ত করে দেয় এবং এর ফলে শেওলা বৃদ্ধির প্রাচুর্যতা দেখা যায়।
  • ফসফরাসের প্রভাবে মাছ সুস্বাদু হয়। এর অভাবে মাছ দুর্বল হয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
  • পরিমিত ফফরাস্ সরবরাহের জন্য পুকুরে ০.২-০.৪ পি.পি.এম ফসফেট থাকা দরকার।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসফরাস্ সার পুকুরের তলদেশের মাটিতে আবদ্ধ নাইট্রোজেন্‌কে মুক্ত করে সরাসরি শেওলা জন্মাতে সাহায্য করে এবং এ জন্যই নাইট্রোজেন সার ব্যবহার না করেও শুধু ফসফরাস্ সার দিয়েও ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে।
  • ফফেট সার মাছের পুকুরের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকারি। যদি ফসফেটকে চুনের সাথে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায়। চুন দিয়ে পানি নিরপেক্ষ করলেও ফসফেট ছাড়া উৎপাদন ভালো হয় না।

ট্রিফল সুপার ফসফেট

এটা সাদা বর্ণের ধূসর সার। সামান্য পরিমাণে চুনীকৃত খনিজ ফসফেটের (Rock Phosphate) সাথে সালফিউরিক এসিডের বিক্রিয়ার ফলে এটা সৃষ্টি হয়। এর রাসায়নিক ফরমুলা Cp (H2Po4)2 সুপার ফসফেট সারে সালফার ও ক্যাসিয়াম যথাক্রমে ১২ ও ১৮ ভাগ থাকে। সালফার ও ক্যাসিয়াম, জিসাম বা ক্যাসিয়াম সালফেট আকারে থাকে।

  • সুপার ফসফেটের সাথে অ্যামোনিয়াম সালফেট একত্রে মিশিয়ে ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • সুপার ফসফেট ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়। এটা নিরপেক্ষ সার।
  • গবেষণাগারে পরীক্ষার এটা অমুবিক্রিয়া প্রদর্শন করে। তাই এটা অম্লত্ব বৃদ্ধিকারী সার বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু জমিতে প্রয়োগের পর এটা জমিতে P.H মানের পরিবর্তন আনয়ন করে না। দেখা গেছে যে, অতিরিক্ত অম্ল মাটিতে প্রয়োগ করলে এটা মাটির PH মান বাড়ায়। আবার অধিক ক্ষার মাটিতে প্রযুক্ত হলে PH মান কিছুটা কমে যায়।

ফস্ফরিক এসিডের (P2Q5) পরিমাণ অনুযায়ী ৩টি গ্রেডে তৈরি করা যায়। যথা:

  1. সিংগল্‌ সুপার ফসফেট (Single super phosphate) ফস্ফরিক এসিডের পরিমাণ প্রায় ১৮% ভাগ।
  2. ডবল্ সুপার্ ফসফেট (Double super phosphate) ফস্ফরিক এসিডের পরিমাণ প্রায় ৩২%।
  3. ট্রিপল্ সুপার্ ফসফেট (Triple super phosphate) যাতে ফস্ফরিক্ এসিডের পরিমাণ প্রায় ৪৮% ভাগ।

ট্রিপল সুপার ফসফেট

  • (Tripl super phosphate) এটা সংক্ষেপে টি.এস.পি নামে বহুল পরিচিত। এটা ফসফরাস্ জাতীয় প্রধান অজৈব সার। হতে ফস্ফরিক এসিডের হার প্রায় ৪৮%।
  • এটা দানাদার গোলাকৃতির দূসারাভ পদার্থ।
  • পুকুর ও দীঘিতে এ জাতীয় সারই বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
  • খনিজ রক ফস্‌ফেটকে মিহি গুড়া করে তার সাথে ফসফরিক এসিডের বিক্রিয়ার মাধ্যমে এ সার তৈরি করা হয়। রক ফসফেটের সাথে সাফিউরিক এসিডের বিক্রিয়ার মাধ্যমে।

ডাই এমোনিয়াম ফসফেট (D. A. P.)

এটা এমন একটি রাসায়নিক সার যার মধ্যে শতকরা ৪৬ ভাগ ফসফেট ও শতকরা ১৮ ভাগ নাইট্রোজেন্ আছে। অর্থাৎ ডি.এ. পি-র মধ্যে প্রচলিত টি.এস.পি সারের সমপরিমাণ ফসফেট ছাড়াও শতকরা প্রায় ১৮ ভাগ নাইট্রোজেন আছে। তাই ১ মণ ডাই এমোনিয়াম ফসফেট সার হতে ১ মন টি.এস.পি এবং ১৬ সের ইউরিয়া সারের সম উদ্ভিদ খাদ্যোপাদান পাওয়া যায়।

মাছ চাষে ডি.এস.পি ব্যবহারের সুবিধা

এ সারের ব্যবহারের সুবিধাগুলো হলো-

  • টি.এস.পি সার যেমন জমাট বেঁধে যায় এ সার তেমন জমাট বাঁধে না। কাজেই এটা গুদামজাতকরণ ও পরিবহন করা তুলনামূরক সহজ। তা ছাড়া এটা ব্যবহারে অপচয়ও কম হয়।
  • এ সারের মধ্যে ৬০% খাদ্যোপাদান থাকে। অপর পক্ষে টি.এস.পি সার খাদ্যোপাদান
  • আছে মাত্র ৪৭% ভাগ। কাজেই গুণাগুণের বিচারে ডি.এ.পি. সার টি.এস.পি সার অপেক্ষা ভালো।
  • যেহেতু এটা টি.এস.পি সারের মতোই দানাদার, তাই ছিটিয়ে ব্যবহার করা সহজ।
  • আর একটি বিশেষ গুণ সারের মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফস্‌ফেট মুক্তভাবে একটি রাসায়নিক বস্তু হিসেবে অবস্থান করে। ফলে সারের কোনো অপচয় ঘটে না।

পটাস সার

  • পটাস সার ফটোসিনথিসিস্ বা সালোক সংশ্লেষণ ঘটায় এবং শেওলার সবুজ কণা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া পটাশ্ মাছের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও মাছের মাংসপেশী দৃঢ় করে দেয়।
  • পটাশ্ ও ক্যাসিয়াম সরবরাহের মধ্য দিয়ে পানির ক্ষরত্ব ১০০ ভাগই বজায় রাখতে পারে এবং এতে মাছ সহজে রোগাক্রান্ত হয় না। যে সমস্ত সার প্রয়োগ করলে মাটিতে পটাসিয়ামের অভাব দূরীভূত হয় তাদেরকে পটাশ প্রদান সার বলে। যেমন- মিউরেট অভ পটাশ, সালফেট অভ্ পটাশ, পটাসিয়াম নাইট্রেট, পটাসিয়াম কার্বনেট ইত্যাদি।

মিউরেট অভ পটাস্ (Muriate মতো potash KCI, 60% K2O)

  • এটা দানাদার লালচে বর্ণের সার। এটাতে শতকরা ৬০ ভাগ পটাসিয়াম থাকে।
  • এটা মাটিতে প্রয়োগের পর বিনষ্ট হয় না। যেহেতু মাটির বিনিময় যোগ্য রাসায়নিক পদার্থ এদের আবদ্ধ করে রাখে।
  • অম্লীয় মাটিতে এটা পটাসিয়াম সালফেট অপেক্ষা ভালো কাজ করে।
  • ক্লোরাইড আয়নগুলো তুলনামূলক কম শক্তভাবে আবদ্ধ থাকে সালফেট আয়ন অপেক্ষা। তা এটেল ও পলি মাটিতে ভালোভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ক্ষারীয় মৃত্তিকা ক্লোরাইড আয়ন ক্ষতিকর বিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই এটা ব্যবহারের সাথে জৈব পদার্থ সংযোজন প্রয়োজনীয়।

পটাসিয়াম সালফেট (Potassium Sulphate K2SO4 ৫০% K2O)

এটা লবণ জাতীয় সার। এর মধ্যে ৫০% ভাগ পানিতে দ্রব্যণীয় K2O থাকে। এটা মিউরেট অভ্ পটাস অপেক্ষা অনেক মূল্যবান। ক্ষারীয় এবং ক্যাল্‌ল্কেরীয়াস্ (Culcareous) প্রকৃতির মৃত্তিকায় এ সার ব্যবহার করা যেতে পারে।

নাইট্রোজেন সার

  • নাইট্রোজেন সারে শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পুকুরের পানি সবুজ রং ধারণ করে। উদ্ভিদ জাতীয় শেওলাতে মাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে ও মাংসপেশী বলবান হয়।
  • নাইট্রোজেন্ অভাবে পুকুরের পানি বিবর্ণরূপ ধারণ করে ও মাছের খাবার থাকে না। পুকুরের পানিতে পরিমিত নাইট্রোজেন সরবরাহের জন্য ০.০৬-০.১ পি.পি. এম নাইট্রেট থাকা প্রয়োজন।
  • নাইট্রোজেন চক্রের মাধ্যমে পানিতে বাতাস হতে নাইট্রোজেন স্থিরীকৃত হয়। পুকুরে জৈবিক পদার্থ ও ফসফেট থাকলে পুকুরের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন আপনা আপনিতেই হয়। এ জন্যই নাইট্রোজেন্ সার প্রয়োগের প্রতি এতোটা গুরুত্ব আরোপ না করলেও চলতে পারে। তবে নাইট্রোজেন সারের ব্যবহারে খুব তাড়াতাড়ি শেওলা জন্মে।
  • যে সব পুকুরে প্রচুর সালফেট আছে সে সব পুকুর অ্যামোনিয়াম সালফেট ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ, এতে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। পুকুর থেকে মাছ সরিয়ে নিলে মাছের দেহে যে নাইট্রোজেন্‌ থাকে তা পুকুর থেকে বেড়িয়ে যায়।
See also  বিল-হাওড়ে মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনা, প্লাবন-ভূমিতে পেনে মাছ চাষ, মহাসড়ক ও রেলওয়ের পাশের জলাশয়ে মাছ চাষ, মাছ চাষ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা

মাছ চাষে জৈব সার এর প্রয়োগ

  • জৈব সার ব্যবহারের প্রচলন বেশি। কারণ, এটা সহজ লভ্য ও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। জৈব সার ব্যবহারে নিম্নলিখিত উপকার পাওয়া যায়:
  • জৈব সার অক্সিডাইস্ হয়ে ফটোসিনথেসিস্-এর জন্য কার্বন-অক্সাইড সরবরাহ করে। তবে অতিরিক্ত জৈব সার মাছের পুকুরের জন্য ক্ষতিকর।
  • জৈব সার ব্যাক্টেরিয়ার মতো অনেক ক্ষুদ্র প্রাণীর বাসস্থানের কাজ করে।
  • জৈব সার পচে গিয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত বস্তুর (Detritious) জন্ম দেয় এবং তা অনেক প্রাণীরা খায়। এ সব প্রাণীরা মাছের খাবার। আবার কিছু কিছু মাছ এ সব ধ্বংস প্রাপ্ত বস্তু খেয়ে থাকে।
  • জৈব সার পুকুরের কাদায় ভিটামিন ও পরিপুষ্টি পদার্থের জন্ম দেয়।
  • জৈবিক সার উলট পালট করলে পুকুরের উর্বরতা বৃদ্ধির সহায়ক হয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, অতিরিক্ত জৈব সার অক্সিডাইজের ফলে অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়ে পুকুর অক্সিজেনের অভাব সৃষ্টি না হয়। এ জন্য পুকুরে অতিরিক্ত কাদা থাকাও ভালো নয়।
  • জৈবিক সার পুকুরে এক বা একাধিক কোণায় জমা করে দিতে হবে। এতে অক্সিডেশন আস্তে আস্তে চলবে এবং পুকুরের অক্সিজেন নষ্ট করার সম্ভাবনাও কম থাকবে। এ ছাড়া এভাবে সার জমিয়ে রাখলে সারের আশে পাশে নানা জাতীয় কীটের শুক, টিউবিফেক্স ও ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম নিবে এবং এগুলো মাছ সরাসরি খেতে পারবে।

গাছ-গাছড়ার পাতা

গাছ-গাছড়ার পাতা, ডালা ইত্যাদি পুকুরের কিণারায় স্তুপ করে এদের উপর কাদা দিয়ে দিলে এগুলো আস্তে আস্তে পচে গিয়ে সারবস্তু সৃষ্টি করে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এ ধরণের সবুজ সারে পচনের ফলে অক্সিজেনের অভাব সৃষ্টি না হয়। অতঃপর নার্সারি পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর খেশাড়ি, মাষকালাই প্রভৃতি বপণ করা যেতে পারে এবং পানি আসার সঙ্গে এ সব ফসলের গাছ-গাছড়া পচে গিয়ে সার বস্তু সৃষ্টি হতে পারে।

তরল সার

  • গোয়াল, আস্তাবল ও অন্যান্য গৃহপালিত জন্তুর বাসস্থান ধোয়ানো পানি পুকুরে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ রকম সারে জুয়োপ্ল্যাঙ্কটন্‌ খুব বেশি জন্ম হয়।
  • এ সার অল্প অল্প করে ঘন ঘন ব্যবহারে তন্তুজাতীয় শেওলা (Filamentous algae) ভালো জন্মায়। এ সার সর্বদাই পুকুরের মাঝখানের পানিতে ব্যবহার করতে হবে নতুবা সার পাড়ের কাছে দিলে পাড়ের উদ্ভিদ ঐসব সার পেয়ে দ্রুত বাড়বে।
  • পোনা মাছের পুকুরে অল্প অল্প করে এ সার ব্যবহার করা প্রয়োজন। নর্দমার পানিও তরল সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন বেশি জৈবিক পদার্থ ঢোকার ফলে জলাশয়ে অক্সিজেনের অভাব না হয় এবং পানি দূষিত না হয়।
  • বর্ষাকালে নর্দমার পানি লেকে বা হরদে প্রচুর জৈবিক পদার্থ বহন করে নিয়ে গেলে ও নতুন পানির প্রাচুর্যতা হেতু এসব জৈবিক পদার্থ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু শীতকালে নর্দমার পানি ব্যবহারের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন আছে।

গোবর সার

  • গোবরও একটি উৎকৃষ্ট মানের সার। পুকুরের গোবর সার ব্যবহার করলে পুকুরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডেট্রিটাস্ ও হিউমাস্ সৃষ্টি হয়। এছাড়া রটিফেরা ও বিভিন্ন ক্রাষ্টিসিয়ার জন্ম হয়। এভাবে পুকুরের উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • নতুন পুকুরে গোবর ব্যবহার করলে এর মাটি মাছ চাষের যোগ্য হয়ে ওঠে। পোনা মাছের পুকুরের জন্য গোবর সার অত্যন্ত ভালো মানের সার।
  • এছাড়া অন্যান্য জৈব সার যেগুলো পুকুরে ব্যবহৃত হয়ে থাকে তাদের মধ্যে খইল, ঘাস মানুষের মল, পচা কচুরিপানা, বাঁশের পাতা ও বিভিন্ন প্রকার খামারজাত সার-ই প্রধান।
  • বিভিন্ন জীবজন্তুর মল-মূত্র রাসায়নিক উপাদানের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তা পরিবর্তনশীল। যে সকল খামারজাত সার ব্যবহার করা হয় তাদের রাসায়নিক উপাদানের একটি গ্রহণযোগ্য গড় হিসাব দেওয়া খুবই কঠিন। কেননা, বেশ কতগুলো পরিবর্তনশীল উপাদান যা নাইট্রোজেন্, ফসফরাস ও পটাসিয়ামের পরিমাণ দ্রুত হরাস-বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এ উপাদানগুলো হলো— ১. পশুর প্রকৃতি, ২. বয়স ও বিভিন্ন প্রকৃতির পশু, ৩. খাদ্যের প্রকৃতি, ৪. লিটার জাত দ্রব্য, ৫. রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি।
  • গড়ে খাজারজাত সারের পুষ্টি উপাদানের একটি তালিকা দেওয়া হলো। যেমন— নাইট্রোজেন ০.৫%, ফসফরিক এসিড ০.২৫% পটাশ ০.৫%। অবশ্য এ গড় হিসাব পরিবর্তনশীল। নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম ছাড়াও এতে কিছু পরিমাণ ক্যাল্‌সিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার এবং সকল গৌণ উপাদান রয়েছে।

মাছ চাষে সার প্রয়োগের পরিমাণ

  • পুকুরের পানিতে পরিমাণ মতো সার প্রয়োগ করার জন্যে পুকুরের প্রাকৃতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক পরিস্থিতি জানা প্রয়োজন।
  • নির্ধারিত পরিমাণের কম সার প্রয়োগ করলে এর উপকারিতা যেমন তাড়াতাড়ি বুঝা যায় না, অন্যদিকে তেমনি বেশি পরিমাণ সার প্রয়োগের ফলে পুকুরের পানিতে শেওলা জাতীয় উদ্ভিদের পরিমাণ খুবই বেড়ে যায়। এগুলোও পচে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মাছ চাষের প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে এবং পানির গুণাবলি নষ্ট করে দেয়।
  • সে জন্যই যে পরিমাণ সার প্রযোগ করার মাত্রা স্থির করা হয় তাকে কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত করে প্রতি ৭ দিন বা ১৫ দিন বা ১ মাস অন্তর অন্তর প্রয়োগ করলে প্রতি বারে ব্যবহারের উপকারিতা বা অপকারিতা বুঝা যায়। অবস্থাভেদে মাত্রা কমানো বা বাড়ানো যেতে পারে।
  • রাসায়নিক সার ব্যবহারের পুকুরের পানির পরিবর্তন খুব তাড়াতাড়ি পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পক্ষান্তরে, জৈব সারের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। সার প্রয়োগ করার কোনো নির্ধারিত সময় নেই। অবস্থাভেদে যে কোনো সময় সার দেওয়া চলে। তবে শীতকালে এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম।
  • যে পুকুরের মাটি দোঁ-আশ, পলি বা এঁটেল সে পুকুরে অজৈব বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করাই উচিত। বালি বা কঙ্করময় পুকুরে জৈব সার প্রয়োগ না করে অজৈব সার দেওয়া হলে দ্রুত কোনো ফল হবে না। নুতন পুকুরে সাধারণত জৈব সারই প্রয়োগ করতে হয়।
  • ক্ষেত্র বিশেষ জৈব ও অজৈব সার, মিশ্রিত করে প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। জৈব ও অজৈব সার মিশ্রিত করে সে মিশ্রিত সারের সৃষ্টি হয় তাকে মিশ্র সার বলে।

মাছ চাষে সার প্ৰয়োগ বিধি

  1. চুন প্রয়োগের পর অন্যান্য সার ব্যবহার করতে হবে।
  2. রাসায়নিক সার মোটা কাপড়ে অথবা চটে বেঁধে পুকুরে ভাসমান অবস্থায় ফেলে রাখতে হবে।
  3. রাসায়নিক সার কয়েক দফায় ভাগ করে প্রয়োগ করলে পরিমাণের অল্পতা বা আধিক্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  4. খইল গুড়া করে পুকুরের কিণারা দিয়ে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
  5. রাসায়নিক সার প্রয়োগের পর খইল প্রয়োগ করতে হবে।
  6. কোনো কোনো রাসায়নিক সার এসিড জাতীয়। কাজেই যে পুকুরে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় সে পুকুরে বছরে ১-২ বার চুন দেওয়া উপকারী।
  7. সার প্রয়োগের পর পুকুরে জাল টানা উচিত।

মাছের খাবার

  • নদ-নদী, হাওড়-বাওড় ও এমন কি বড় বড় দীঘিতেও হিজল, শেওড়া প্রভৃতি গাছের শাখা জায়গায় জায়গায় ফেলে রাখা হয় এবং এর মধ্যে বাঁশ পুঁতে দেওয়া হয়। এ রকম বাঁশের সঙ্গে মাষকলাই, চিনির গাদ, খইল প্রভৃতি উপাদান মাছের খাবার হিসেবে ফেলে রাখা হয়।
  • এ ধরণের কৃত্রিম খাবারে মাছ আকৃষ্ট হয় ও বহু মাছের সমাগত হয়। গাছের শাখা ও বাঁশ একত্র করে কোনো কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার পর যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাকে ‘কাঠা’ নামে অভিহিত করা হয়।
  • কাঠার মধ্যে যে সব গাছের শাখা ব্যবহৃত হয় তাদের মধ্যে হিজল গাছই প্রধান। এছাড়া ঝিকাগাছ, শেওড়া ও আম প্রভৃতি গাছের শাখাও ব্যবহৃত হয়। শেওড়া গাছের চামড়া পাতলা এবং পঁচে শিং, কই ও মাগুর প্রভৃতি মাছের খাবার তৈরি হয়।
  • হিজল ও ঝিকাগাছের ডালপালা থেকে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউস মাছেরা উৎকৃষ্ট মানের খাবার পেয়ে থাকে। এ গাছের চামড়া মোটা ও নরম এবং পানিতে ফেলার কিছু দিনের মধ্যে পচে নরম হয়ে যায় ও মেথির মতো ঘ্রাণের সৃষ্টি হয়। এ জাতীয় গাছ পচার প্রতি চিংড়িরও আকর্ষণ আছে।
  • বদ্ধ পানিতে হিজল গাছ কাঠা হিসেবে দেওয়া যায় না। এ গাছের কাঁচা রস মাছ সহ্য করতে পারে না। এসব গাছের শাখা প্রশাখা পানিতে রাখার পর এর চারপাশে ও মাঝখানে সারিবদ্ধভাবে বাঁশ পুঁতে দেওয়া হয়।
See also  (18 টি) মাছের রোগ ও তার কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিষেধক/প্রতিকার#আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ#চাষ মাছ চাষ করার সহজ উপায়#মাছ চাষের পদ্ধতি#মাছ চাষের নিয়ম

বাঁশ পুঁতে রাখার কয়েকটি উপকারিতা

এ রকমভাবে বাঁশ পুঁতে রাখার কয়েকটি উপকারিতা আছে, যেমন-

  • পোঁতা বাঁশের চারধারে তাড়াতাড়ি শেওলা জমা হয়, আর এ শেওলা মাছেরা খেয়ে থাকে। বাঁশের আশ্রয়ে মাছেরা বাস করে।
  • মাছ বাঁশের সংগে ঘষাঘষি করে, এতে মাছের ব্যায়াম হয় এবং রোগাক্রান্ত মাছ বাঁশের সাহায্যে নিজের শরীরের রোগ দূর করার চেষ্টা করে।
  • দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে মাছকে রক্ষ করার জন্য জলাশয়ে কাঠা দেওয়া ও বাঁশ পোঁতা একটি উত্তম উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • বাঁশের উপস্থিতিতে শিশু, উদ ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীরা কাঠার মধ্যে আশ্রিত মাছকে সহজে আক্রমণ করতে পারে না।

বিল-বাওড়ে মাছের কৃত্রিম খাবার

বিল-বাওড়ে মাছের কৃত্রিম খাবার হিসেবে যে সব উপাদান ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হলো-

(01) খইল

ভেজা খইল চটের ব্যাগে ভর্তি করে পানি নিচে রেখে দেওয়া হয়। স্বাদু পানির প্রায় সব জাতীয় মাছই এ খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর প্রতি রুই ও কাতলা জাতীয় মাছের আকর্ষণ অন্যান্য মাছের চেয়ে বেশি। খইলের মধ্যে অনেক সময় একাঙ্খি ও মেথি মিশিয়ে দেওয়া হয়।

(02) ফুট খই (ধানের খই)

ভেজা ফুট খই চটের ব্যাগে ভর্তি করে কাঠার মধ্যে পানির নিচে রেখে দেওয়া হয় এবং অল্প দিনের মধ্যে পঁচে গিয়ে এক জাতীয় অতি নরম খাদ্যের সৃষ্টি হয়। এ জাতীয় খাদ্যের প্রতি পাংগাস মাছের আকর্ষণ খুব বেশি।

(03) অর্ধসিদ্ধ লম্বা আলু

অর্ধসিদ্ধ লম্বা আলু চটের ব্যাগে ভর্তি করে কাঁঠার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। এর প্রতি চিতল, বোয়াল, পাবদা ও টেংরা প্রভৃতি মাছের বোঝা খুবই বেশি।

(04) ডাল

মাষকলাই, খেশাড়ি ও মটরের ডাল চটের ব্যাগ ভর্তি করে পানির নিচে রেখে দিলে পঁচে গিয়ে এক প্রকার ঘ্রাণের সৃষ্টি করে। এর প্রতি রুই, কাতলা ও মৃগেল প্রভৃতি মাছের আকর্ষণ আছে।

(05) চাউলের কুঁড়া ও গমের ভূষি

এগুলোও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছই এ খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।

(06) কলার ছড়ি

পাকা বা আধা পাকা বীচি বিহীন কলার ছড়ি অনেক সময় বিল-বাওড়ের কাঠা বা ডাঙার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। প্রধানত চিতল, ফুলই প্রভৃতি মাছই ও খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

(07) পচা পিঠা

চারা ধানের বীজ পচাবার পর মাটির পাতিলের সাহায্যে এক রকম বড় বড় পিঠা তৈরি করা হয়। এগুলোকে পচা পিঠা বলে। এসব পচা পিঠাকেও অনেক সময় কাঠা বা ডাঙার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। এ জাতীয় পিঠার প্রতি মৃগেল ও কালবাউস মাছের আকর্ষণ আছে।

(08) ভাত

ভাত পাক করে ছোট ছোট ঢুলি ভর্তি করে এগুলোকে পানির নিচে বাঁশের সংগে বেঁধে কাঠার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। এ জাতীয় খাবারের প্রতি রুই ও কাতলা জাতীয় মাছের আকর্ষণ খুব প্রবল।

(09) চিনির গাঁদ

বড় বড় মাটির খাঁদায় চিনির গাঁদ (শক্ত অবস্থায়) ভর্তি করে কাঁঠার মধ্যে পানির নিচে সাজিয়ে রাখা হয়। এর গন্ধ ও স্বাদে আকৃষ্ট হয়ে প্রায় সব জাতীয় মাছই চিনির গাঁদ খাবার জন্য দলে দলে কাঠার মধ্যে সমবেত হয়।

(10) খামার সার (পর্চা ঘাষ ও পঁচা গোবর)

  • ঢুলি ভর্তি করে পানির নিচে কাঠার মধ্যে রেখে দিলে প্রায় সব মাছই এর লোভে আকৃষ্ট হয়ে কাঠার মধ্যে জমা হয়। পুকুরে খাবার প্রদান পুকুর-দীঘিতেও উল্লিখিত খাবার প্রয়োগ করা যায়, কিন্তু পানি ও মাছের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে খাবারের পরিমাণ স্থির করে নিতে হবে।
  • জলাশয়ের উৎপাদিকা শক্তি উপর ভিত্তি করে কৃত্রিম খাবারের পরিমাণ স্থির করা হয়। যে জলাশয়ের জৈবিক উৎপাদিকা শক্তি বেশি বা স্থীতিশীল পর্যায়ে আছে, সে জলাশয়কে উর্বর জলাশয় বলা চলে।
  • প্রধানত জলাশয়ের পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় বিরাজমান পরিপুষ্টি পদার্থ, ক্লোরোফিল সম্পন্ন জলজ গাছ-গাছড়া, প্লেঙ্কটার ও কিছু ব্যাক্টেরিয়া জলাশয়ের উর্বরতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যে জলাশয়ের প্রাথমিক উৎপাদিকা শক্তি বেশি সেখানে কৃত্রিম খাবারের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ সরবরাহ করলেও চলতে পারে।
  • সাধারণত পুকুর দীঘিতে বৈশাখ মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত কৃত্রিম খাবার সরবরাহ করা হয়। এ সময় রুই জাতীয় মাছের বৃদ্ধি বেশি এবং সে জন্যই এ সময়ে মাছের খাবারের হারও বেশি।
  • পুকুর দীঘিতে উপস্থিত মোট মাছের ওজনের ২%-৩% ভাগ মাছকে কৃত্রিম খাবার হিসেবে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে বা প্রতিমাসে সরবরাহ করা যায়।
  • প্রতি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এ খাবারের অপচয় না হয়। যদি দেখা যায়, মাছ রীতিমতো এসব খাবার খাচ্ছে না তা হলে খাবারের প্রকরণ বদলাতে হবে এবং খাবারের পরিমাণ আরো কমাতে হবে। আর যদি দেখা যায় এসব খাবার ভক্ষণ করার স্বভাব মাছের মধ্যে খুবই প্রবল হয়ে উঠেছে, তাহলে প্রতিদিন মাছকে খাবার দেওয়া যেতে পারে এবং খাবারের পরিমাণও কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে এবং ঘন ঘন খাবার দেওয়া যেতে পারে।
  • কৃত্রিম খাবার হিসেবে যে সব উপাদান ব্যবহৃত হয় তাদের মধ্যে চালের গুঁড়া, গমের ভূষি, খইল প্রভৃতিই প্রধান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright Notice

কপি করা নিষিদ্ধ!