Skip to content

গরুর রোগের নাম: এনাপ্লাজমোসিস (Anaplasmosis), গরুর রোগের লক্ষণ, গরুর রোগ ও চিকিৎসা, গরুর রোগ ও প্রতিকার

এনাপ্লাজমোসিস (Anaplasmosis) গরুর রোগ এর নির্ণয়, পরিচয়, লক্ষণ, প্রতিকা, প্রকিরোধ, চিকিৎসা


এনাপ্লাজমোসিস রক্তবাহিত গরুর রোগের লক্ষণ, গরুর রোগ ও চিকিৎসা, এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগ ও প্রতিকার এর উপায়সহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগ ‍কি?

এনাপ্লাজমোসিস গরুর একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এটি রক্তবাহিত রোগ।

বাংলাদেশে গরমকালে (মার্চ-নভেম্বর) এনাপ্লাজমোসিস রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি ঘটে থাকে।

অ্যানাপ্লাজমোসিস রোগের শীর্ষটি বসন্ত এবং গ্রীষ্মের মাসগুলিতে দেখা দেয়, যখন রোগের বাহকগুলি সক্রিয় হয়।

এনাপ্লাজমোসিস বিশেষ করে উষ্ণম-লীয় অঞ্চল, অব-উষ্ণম-লীয় অঞ্চল, আমেরিকা ও আফ্রিকায় Endemic আকারে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াতেও এ রোগের সংক্রমণ ঘটে থাকে।

এ রোগে আক্রান্ত গরুর মৃত্যুর হার (২০-৫০%) পর্যন্ত হয়ে থাকে।

তাছাড়া চিকিৎসা খরচও খুব বেশি।

বাংলাদেশে প্রতি বছর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা মূল্যের গাভীর মৃত্যু হয়ে থাকে এবং খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তাই এ রোগের গুরুত্ব অধিক।
বর্তমানে খামারীদের জন্য এ রোগ নতুন ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগের জীবাণুর পরিচয়

এ রোগ রিটেকশিয়ালেস (Rickettsiales) গোত্রের এক প্রকার জীবানু দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। এই জীবানু আকারে খুবই ছোট এবং গোলাকৃতি কিন্তু সাইটোপ্লাজম নেই, তবে কোষ প্রাচীর আছে।

অল্প বয়ষ্ক গরুতে মৃদুভাবে আক্রান্ত হলেও বয়ষ্ক গরুতে তীব্র লক্ষন প্রকাশ পায়।

আক্রান্ত গরুকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দিয়ে সাময়িক সুস্থ করা গেলেও সারা জীবন সে এ রোগের জীবানু বহন করে।

আক্রান্ত গরুকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে পালে রাখলে সকল সুস্থ গরু এ রোগের ঝুকিতে থাকে।

এই জীবাণু লোহিত কণিকার (RBC) স্ট্রোমা অবস্থান করে। লোহিত কণিকায় প্রবেশের সময় জীবাণুর ডায়ামিটার থাকে ০.২-০.৫ মাইক্রোমিটার, এটি বাইনারি ফিসনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে Inclusions body- এর ডায়ামিটার ১ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। Anaplasma Centrale লোহিত কণিকার কেন্দ্রে অবস্থান করে।

এরা লোহিত রক্ত কনিকার স্ট্রোমা তে অবস্থান করে। আক্রান্ত গরুর রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙ্গে দেয় এবং রক্ত পানির মত পাতলা দেখায়।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগটির বিস্তার


এনাপ্লাজমা রোগের জীবানু ছড়াতে সাধারনত ২০ প্রজাতির আঁঠালী বাহক হিসাবে কাজ করে।

তবে Boophilus spp এবং Dermacentor spp জাতীয় আঁঠালী আক্রান্ত পশুর রক্তের মাধ্যমে সুস্থ গরুতে রোগ জীবানু সংক্রামিত করতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে।

স্ত্রী আঁঠালীর তুলনায় পুরুষ আঁঠালী এই জীবানু বেশি ছড়ায়।

আক্রান্ত গরুর বিভিন্ন অস্ত্রোপচার, কাটা ছেড়ে, শিং কাটা, খোজাকরন, কানে ট্যাগ লাগানো, টিকা প্রদান ইত্যাদি ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের মাধ্যমেও এ রোগ সুস্থ গরুতে সংক্রামিত করতে পারে।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগ নির্ণয়

এনাপ্লাজমোসিস নির্ণয় করা এত সহজ নয় কারণ এর লক্ষণগুলি বেশ কয়েকটি অন্যান্য রোগের সাথে মিলে যায়, যা ভুল রোগ নির্ণয় এবং ভুল চিকিৎসার পদ্ধতির দিকে পরিচালিত করে।

প্রায়শই, গরুর অ্যানাপ্লাজমোসিস এই রোগগুলির সাথে বিভ্রান্ত হয় বা মিলে যায় যেমন: অ্যানথ্রাক্স; লেপটোস্পিরোসিস; পাইরোপ্লাজমোসিস; থিওলিরোসিস।

আক্রান্ত এলাকায় এ রোগে আক্রান্ত সন্দেহজনক গরুর রক্ত প্রস্রাব ছাড়াই রক্তশূন্যতা দেখা যাবে। কখনও জন্ডিসে লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

আক্রান্ত গরুর রক্ত ল্যাবেঃ অনুবীক্ষন যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে এই এনাপ্লাজমোসিস (Anaplasmosis) রোগ নির্নয় করতে হয়। অর্থাৎ গ্লাস স্লাইডে নিতে হয়ে।

রক্ত Giemsa strin করলে এ রোগের জীবানু সনাক্ত করা যাবে। ৫০-৬০% লোহিত কণিকা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে।

Indirect FA এবং DNA Probe test করেও এ রোগ নির্নয় করা যাবে।

অথবা Complement fixation এবং  Indirect FA এবং DNA Probe test করেও রোগ নির্ণয় করা যায়।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগের লক্ষণ

এ রোগের তীব্রতা/ মারাত্মকতা গরুর বয়সের ওপর নির্ভর করে। বাছুর গরু খুব মৃদুভাবে আক্রান্ত হয় এবং খুব একটা মারা যায় না। এমনকি ১ বছর বয়সের গরু আক্রান্ত হলে বা লক্ষণ তীব্র হলেও চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক গরুতে এনাপ্লাজমা খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করে। তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং মৃত্যুর হার ২০-৫০%। সব প্রজাতির গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়।

  • আক্রান্ত গরু ঝিমাবে, মনমরা হয়ে থাকবে, ক্ষুধামন্দা, গায়ে জ্বর সাধারণত ১০৪-১০৬ ফারেন হাইট, দুধ উৎপাদন দ্রুত কমে যাবে।
  • গাভীতে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ও বাচ্চা প্রসবের পরপরই এ রোগে আক্রান্তের হার খুব বেশি।
  • প্রথম দিকে গাভীর খাওয়ার রুচি ধীরে ধীরে কমে যাবে এবং এক পর্যায়ে সম্পুর্ন খাবার বন্ধ করে দেয়।
  • খিঁচুনি এবং জ্বর।
  • গাভীর দীর্ঘমেয়াদী (১০৪-১০৬) ডিঃ ফাঃ জ্বর হয় এবং পশম খাড়া হয়ে থাকে।
  • পানি পিপাসা বেড়ে যায় এবং ঘনঘন শ্বাস নিতে থাকে।
  • আক্রান্ত গরু হাটাহাটি করলে শ্বাস-কষ্টের লক্ষন দেখা যাবে।
  • রক্তশুন্যতা, হিমোগ্লোবিন ইউরিয়া ও জন্ডিস দেখা দেয়।
  • লিভার দুর্বল হয়ে যায়। দাত কাটে।
  • দিন দিন স্বাস্থ্য শুকিয়ে যায় এবং দুধের উৎপাদন কমে যায়।
  • গাভী শুয়ে পড়লে আর উঠে দাড়াতে পারেনা এবং প্রসাব পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়।
  • এ রোগে রক্তশূন্যতা জন্ডিস ও জ্বরের লক্ষণ দেখা যায়।
  • প্লীহা, যকৃত ও পিত্তথলি আকারে বড় হয়ে যায়। পিত্তথলি ফুলে যায়।
  • আক্রান্ত গরুর লোহিত কণিকা ভেঙে ধ্বংস হয়ে যায়, রক্ত পাতলা পানির মতো দেখায়।
  • রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে রক্তশূন্যতা দেখা দেবে, উল্লেখযোগ্যভাবে ওজন কমে যাবে, শরীর একদম ভেঙে যাবে, পানিশূন্যতা তীব্রভাবে লক্ষণীয়।
  • আক্রান্ত গরুকে হাঁটাহাঁটি করালে শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যাবে।
  • রক্তশূন্যতা ও জন্ডিস ছাড়াই যদি গরু দ্রুত মারা যায়, সে ক্ষেত্রে তড়কার মতো মৃত গরুর প্লিহা ফোলা/বড় দেখা যাবে।

যদি চিকিৎসার পর গরু বেঁচে যায় তবে ধীরে ধীরে সবল হয়ে থাকে। বেঁচে যাওয়া গরু কখনও এ রোগের সারা জীবন বাহক হিসেবে কাজ করে।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগ প্রতিকার ও প্রতিরোধ

  • প্রতি ৩/৪ মাস পরপর Ivermectin গ্রুপের ইনজেকশন ০.২ মিঃগ্রাঃ/ কেজি দৈহিক ওজন হিসাবে প্রয়োগ করে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
  • Ivermectin প্রিপারেশন গ্রহন করা সত্বেও যদি কোন গরু এ রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে আক্রান্ত গরুকে সুস্থ গরুর কাছ থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
  • এনাপ্লাজমোসিস রোগে আক্রান্ত গরুকে কোন ভাবেই পালে রাখা যাবে না।
  • একই সিরিঞ্জ ও নিডিল একাধিক গরুতে ব্যবহার করা যাবে না।
  • গরুর ঘড়ের চারপাশ পরিষ্কার রাখা যাতে মশা মাছির উপদ্রপ না থাকে।
  • নিয়মিত প্রতিদিন একবার হলেও গরুকে গোসল করাতে হবে।
  • আঁঠালীর বংশ বিস্তারের ঋতু (মার্চ-নভেম্বর) এ সময় গরুকে আঁঠালীনাশক ঔষধ প্রয়োগে গোসল বা স্প্রে করতে হবে।
  • গর্ভাবস্থায় রক্তবর্ধক হিসাবে আয়রন এর সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • গরুর স্বাস্থ্য সম্মত বাসস্থান ও সুষম খাবার নিশ্চিত করা।

এনাপ্লাজমোসিস গরুর রোগ ও চিকিৎসা

সতর্কিকরণ: রেজিষ্টার্ড ভেটেরিনারিয়ান এর পরামর্শ অনুযায়ী নিন্মলিখিত ব্যবস্থাপত্রটি গ্রহন করা যেতে পারে।

এনাপ্লাজমোসিস (Anaplasmosis) গরুর রোগ এর নির্ণয়, পরিচয়, লক্ষণ, প্রতিকা, প্রকিরোধ,  চিকিৎসা

® এন্টিহিস্টামিন হিসাবে Pheniramine Maleate BP গ্রুপের যেমন inj: ASTAVET 100ml (Acme) 1cc/20kg b wt হিসাবে মাংশে দিতে হবে। শুধুমাত্র ইমিডোকার্ব ও স্যালাইন ইন্জেকশন দেওয়ার সময় প্রয়োগ করতে হবে।

® ইমিডোকার্ব গ্রুপের যেমন inj: COMIDOCARB 10ml (komipharma, korea) 1cc/40kg b wt অনুযায়ী মাংশে দিতে হবে। ২য় ডোজ ৫-৭ দিন পর পুনরায় আবার দিতে হতে পারে। বিঃদ্রঃ inj দেয়ার পর গাভীর নাক মুখ দিয়ে লালা ঝরতে পারে। এমন হলে মাথায় পানি দিতে হবে।

® অক্সিটেট্রাসাইক্লিন গ্রুপের যেমন inj: RENAMYCIN-100ml (Renata) 1cc/10kg b wt হিসাবে ধীরে ধীরে রক্তশিরায়/মাংশে দিতে হবে ১৪ দিন। সবচেয়ে কার্যকরী হবে দৈনিক (10% Dextrose saline1000cc সহযোগে Renamycin-100) মাত্রানুযায়ী ধীরে ধীরে রক্ত শিরায় দিলে।

® আয়রন টনিক Syr: FEROVET 1000ml (Acme) বড় গরুতে দৈনিক ১০০ মিঃলিঃ করে কমপক্ষে ৩০ দিন খাওয়াতে হবে।

® লিভার টনিক Syr: Restoliv 500ml (Opsonin) বড় গরুতে দৈনিক ২০ মিঃলিঃ করে কমপক্ষে ১৪ দিন খাওয়াতে হবে।

® inj: Hemovet 10ml (Renata) বড় গরুতে 10-20cc করে ২৪-৪৮ ঘন্টা পরপর মাংশে ১৪/১৫ দিন দিতে হবে।
এনাপ্লাজমা রোগের চিকিৎসায় inj: Hemovet যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.